লেখক: মোঃ লিটন আহমেদ
Founder & President, U.S. Bangladesh Chamber of Commerce & Industry (USBCCI)
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আজ আর শুধু কূটনৈতিক সৌহার্দ্য বা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত পাঁচ দশকে এই সম্পর্ক একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ একক রপ্তানি বাজার। প্রতি বছর ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। তবে এই সাফল্যের পরও বাস্তবতা হলো—৩৪ কোটিরও বেশি ভোক্তার এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় আমাদের উপস্থিতি এখনও সীমিত।
দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধুমাত্র একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এখন সময় এসেছে রপ্তানি বৈচিত্র্যের মাধ্যমে “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার।
বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম ও কিচেনওয়্যার, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি পণ্য, জুটজাত পরিবেশবান্ধব পণ্য, খেলনা, জুতা, ব্যাগ, লাগেজ, পেট কেয়ার পণ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় অর্ধমিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশি এবং কয়েক কোটি দক্ষিণ এশীয়, মধ্যপ্রাচ্য, হিস্পানিক, আফ্রিকান ও মূলধারার আমেরিকান ভোক্তাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই বাজার কেবল প্রবাসীদের জন্য নয়; এটি বিশ্বমানের ব্র্যান্ড গড়ে তোলার একটি বাস্তব ক্ষেত্র।
এই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে ৭০০টিরও বেশি খাদ্য ও নন-ফুড পণ্য বাজারজাত করছে। গত অর্থবছরে তাদের রপ্তানি ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের পণ্য বর্তমানে Walmart, Target, Dollar Tree, Family Dollar, Dollar General, Food Town, K-Townসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় রিটেইল চেইনে বিক্রি হচ্ছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।
তবে সুযোগের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মান, FDA-সহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা, উন্নত পরীক্ষাগার সুবিধা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিং—এসব ক্ষেত্রে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তুলনায় দীর্ঘ লিড টাইম, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আধুনিক সমুদ্রবন্দর, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, কোল্ড চেইন অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, ডিজিটাল রপ্তানি ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকস উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং। বিশ্বের অনেক দেশ শুধু পণ্য নয়, একটি জাতীয় ব্র্যান্ডও রপ্তানি করে। বাংলাদেশকেও “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডকে গুণগত মান, আস্থা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উৎপাদনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ট্রেড শো, B2B বিজনেস ম্যাচমেকিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে আরও সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা শুধু ক্রেতা নন; তারা বিনিয়োগকারী, পরিবেশক, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারেন। তাদের অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং বাজার সম্পর্কে জ্ঞান বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
U.S. Bangladesh Chamber of Commerce & Industry (USBCCI) দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ট্রেড এক্সপো, ব্যবসায়িক সম্মেলন, বিনিয়োগ ফোরাম, B2B ম্যাচমেকিং এবং প্রবাসী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
আমার বিশ্বাস, আগামী দশকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশ পাবে নতুন বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, অধিক কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাবে একটি নির্ভরযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক, টেকসই এবং বিশ্বস্ত উৎপাদন অংশীদার।
এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এখনই সময় রপ্তানিকে বহুমুখী করার। এখনই সময় “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডকে বিশ্ববাজারে নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গল্প নয়; এটি আগামী দিনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের গল্প।